শ্রম ও শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে প্রেরণার বাতিঘর আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। অগণন শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের অধিকার সুরক্ষার দাবিতে এই দিনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আওয়াজ ওঠে। সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম কিংবা মানববন্ধনের হিড়িক পড়ে যায়।

সবার দাবির মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে, শ্রমিকের নায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত এবং তাদের প্রতি চলা অবিচার বন্ধ করা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, নানাবিধ শ্রম আইন করেও শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

ক্যামেরার সামনে বড় গলায় শ্রমিক অধিকারের কথা বলে মুখে ফেনা উঠানো ব্যক্তিই দিনশেষে কাজের মেয়েকে নির্মম নির্যাতন করেন যেটা গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়। সারা মাস খাটিয়ে বেতন নিয়ে টালবাহানার অভিযোগও বহু রথী মহারথীর বিরুদ্ধে। এসব অনাচার অবিচার দূরীকরণে ইসলামি জীবনবিধান অনুসরণের বিকল্প নেই।

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসাবে পৃথিবীর সব খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার নিশ্চিত করেছে। শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের যাবতীয় সমস্যার সঠিক, ন্যায়ানুগ, যুক্তি ও বাস্তবসম্মত সমাধান দিয়েছে।

বৈধ পথে খেটে খাওয়াকে ইসলাম উৎসাহিত করেছে। বিশ্বনবি (সা.) নিজ হাতে উপার্জন করে খেতেন এবং এতেই খুব বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তিনি বলেছেন, যারা সৎ পথে জীবিকা নির্বাহ করে তারা খোদার প্রিয় বন্ধু।

মহানবি (সা.) ছিলেন শ্রমিকবান্ধব অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি এমন একটি সমাজব্যবস্থা কায়েমের রূপরেখা দিয়েছেন, যেখানে থাকবে না জুলুম-শোষণ কিংবা দুর্বলকে নিষ্পেষিত করার মতো ঘৃণ্য প্রবণতা।

তিনি শিখিয়েছেন শ্রমিকও মানুষ, তাদেরও সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার আছে। মানবতার মুক্তির মহাসনদ নামে খ্যাত বিদায় হজের ভাষণে তিনি বলেছেন ‘তোমাদের অধীনস্তদের প্রতি খেয়াল রাখবে। তোমরা যা খাবে তাদেরও তা খাওয়াবে, তোমরা যা পরবে তাদেরও তা পরাবে’। (মুসলিম, তিরমিজি)।

নবিজি (সা.) খেটে খাওয়া শ্রমজীবীকে ভীষণ ভালোবাসতেন। মক্কা বিজয়ের দিন কাবা ঘরে প্রথম প্রবেশের সময় তিনি শ্রমজীবী বেলাল (রা.) ও খাব্বাব (রা.)কে সঙ্গে রেখেছিলেন।

শুধু তাই নয়, হজরত বেলাল (রা.)কে ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন বানিয়েছিলেন। অথচ ইসলাম পূর্ব যুগে হাবশী গোলাম বেলালের কোনো সামাজিক মর্যাদা ছিল না।

ইসলাম বেলাল (রা.)কে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। হজরত আনাস (রা.) বলেন, আমি দশ বছর নবিজি (সা.)-এর খেদমত করেছি। অথচ দীর্ঘ এ সময়ে তিনি কখনো আমাকে ধমক দেননি। তিনি খেতে বসলে আমাকে সঙ্গে নিয়েই খেতেন। একই প্লেটে খেতাম আমরা।

শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বনবি (সা.) সোচ্চার ছিলেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবি কারিম (সা.) বলেন, তোমরা ঘাম শুকানোর আগে শ্রমিককে তার মজুরি দিয়ে দাও।

ইবনে মাজাহ, হাদিস নং-২৪৪৩। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে বিশ্বনবি (সা.) বলেন, আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘কিয়ামতের দিবসে আমি নিজে তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাদী হব। এক ব্যক্তি, যে আমার নামে ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করল।

আরেক ব্যক্তি, যে কোনো স্বাধীন মানুষকে বিক্রি করে তার মূল্য ভোগ করল। অপর ব্যক্তি, যে কোনো শ্রমিক নিয়োগ করে তার থেকে পুরো কাজ আদায় করেও তার পারিশ্রমিক দেয় না।

বুখারি, হাদিস নং ২২২৭। কোদাল চালাতে চালাতে একজন সাহাবির হাতে কালো দাগ পড়লে নবিজি (সা.) তার হাতে আলতো করে গভীর মমতা ও মর্যাদার সঙ্গে চুমু খেয়েছিলেন। শ্রমিককে ভালোবাসা এবং তার অধিকার প্রতিষ্ঠায় এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত বিশ্বনবির (সা.) জীবনে রয়েছে।

শ্রমিক ও অধীনস্থ কর্মচারীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ ও তাদের নির্যাতনের ব্যাপারে তিনি কঠোর ধমক দিয়েছেন। ইবনে মাজায় বর্ণিত একটি হাদিসে হযরত আবু বকর (রা.) বলেন,

রাসূল (সা.) বলেছেন, ক্ষমতার বলে অধীনস্থ চাকর-চাকরানি বা দাস-দাসীর প্রতি মন্দ আচরণকারী বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না। তিনি আরও বলেন, কেউ তার অধীন ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে এক দোররা মারলেও কেয়ামতের দিন তার থেকে এর বদলা নেওয়া হবে।